Durga Puja শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি, শিল্প, খাবার এবং আনন্দের এক বিশাল মিলনমেলা। শরৎ এলেই কলকাতা যেন নতুন করে সাজতে শুরু করে। পাড়ায় পাড়ায় মণ্ডপ, ঢাকের শব্দ, কাশফুল, নতুন জামাকাপড়, আলোর সাজসজ্জা আর রাতভর প্যান্ডেল হপিং—সব মিলিয়ে শহরের চেহারাই বদলে যায়।
দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এই সময় কলকাতায় আসেন দুর্গাপুজোর বিশেষ পরিবেশ দেখতে। কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপ ও প্রতিমা নির্মাণের শিল্পও এই উৎসবকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। ২০২১ সালে “Durga Puja in Kolkata” UNESCO Intangible Cultural Heritage of Humanity-র স্বীকৃতি পায়।
তাহলে ২০২৬ সালের কলকাতার দুর্গাপুজো কবে? মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত কী কী হবে? মা দুর্গা এবার কীসে আসছেন এবং কীসে ফিরে যাবেন? আর কলকাতায় পুজো দেখতে গেলে কীভাবে যাবেন?
Durga Puja 2026: পুজো কবে?
২০২৬ সালে কলকাতায় দুর্গাপুজোর প্রধান দিনগুলি পড়ছে ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। তবে মহালয়ার দিন থেকেই পুজোর আবহ তৈরি হতে শুরু করবে।
মহালয়া ২০২৬: ১০ অক্টোবর, শনিবার
মহাষষ্ঠী: ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার
মহাসপ্তমী: ১৮ অক্টোবর, রবিবার
মহাষ্টমী: ১৯ অক্টোবর, সোমবার
মহানবমী: ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার
বিজয়া দশমী: ২১ অক্টোবর, বুধবার
Durga Puja 2026: পূজার নির্ঘণ্ট
দিন | তারিখ | কী বিশেষ |
🌺 মহালয়া | ১০ অক্টোবর, শনিবার | দেবীপক্ষের সূচনা, মহিষাসুরমর্দিনী |
🌸 মহাষষ্ঠী | ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার | বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস |
🌿 মহাসপ্তমী | ১৮ অক্টোবর, রবিবার | নবপত্রিকা স্নান ও সপ্তমীর পুজো |
🌺 মহাষ্টমী | ১৯ অক্টোবর, সোমবার | অঞ্জলি, কুমারী পুজো, সন্ধিপুজো |
🔥 মহানবমী | ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার | নবমী পুজো, হোম ও ভোগ |
❤️ বিজয়া দশমী | ২১ অক্টোবর, বুধবার | সিঁদুর খেলা ও বিসর্জন |
মহালয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দুর্গাপুজোর আনন্দ যেন শুরু হয়ে যায় মহালয়ার সকাল থেকেই।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে “মহিষাসুরমর্দিনী” শোনার সঙ্গে বাঙালির দুর্গাপুজোর এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই দিন থেকেই দেবীপক্ষের সূচনা হয় এবং মনে করা হয়, মা দুর্গার মর্ত্যে আগমনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল।
অনেক প্রতিমাশিল্পীও এই সময় প্রতিমার চোখ আঁকার বিশেষ আচার সম্পন্ন করেন, যা চক্ষুদান নামে পরিচিত।
২০২৬ সালে মহালয়া পড়েছে ১০ অক্টোবর, শনিবার।
মা দুর্গা ২০২৬ সালে কীসে আসছেন?
এটি দুর্গাপুজোর একটি মজার এবং বহু পুরনো প্রথা।
শাস্ত্রীয় প্রচলিত গণনা অনুযায়ী, সপ্তমী এবং দশমী কোন বার পড়ছে তার উপর নির্ভর করে দেবীর আগমন ও গমনের বাহন নির্ধারণ করা হয়।
২০২৬ সালে প্রথম সপ্তমী পড়ছে শনিবার, ১৭ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী পড়ছে বুধবার, ২১ অক্টোবর। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মা দুর্গার আগমন হবে ঘোড়ায় এবং গমন হবে নৌকায়।
🐎 ঘোড়ায় আগমন
প্রচলিত বিশ্বাসে ঘোড়া দেবীর বাহন হলে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অশান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
🚣 নৌকায় গমন
নৌকায় দেবীর গমনকে সাধারণত শস্যবৃদ্ধি ও জলবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এগুলি ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাস—এগুলিকে ভবিষ্যৎ ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখা উচিত নয়।
দেবীর চারটি বাহনের অর্থ কী?
দুর্গাপুজোর সঙ্গে সাধারণত চারটি বাহনের কথা বেশি শোনা যায়—
🐘 গজ বা হাতি
হাতিকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালো ফলের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
🐎 ঘোটক বা ঘোড়া
ঘোড়াকে অস্থিরতা, যুদ্ধ বা সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
🚣 নৌকা
নৌকা শস্যবৃদ্ধি ও জলবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে।
🪷 দোলা বা পালকি
দোলাকে প্রচলিত ব্যাখ্যায় অশুভ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
মা দুর্গার আগমন-গমন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এর মধ্যে একটা সুন্দর প্রতীকী ভাবনা রয়েছে।
মা দুর্গা কৈলাস থেকে তাঁর সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসছেন—এই ভাবনাই বাঙালির কাছে দুর্গাপুজোর অন্যতম আবেগ।
চারদিনের আনন্দের পর দশমীর দিন আবার তাঁকে বিদায় জানাতে হয়।
তাই বাঙালির কাছে পুজো শুধু আনন্দ নয়।
আসার আনন্দের সঙ্গে চলে যাওয়ার মনখারাপও জড়িয়ে আছে।
“আবার আসছে বছর এসো মা”—এই কথার মধ্যেই সেই আবেগ লুকিয়ে থাকে।
মহাষষ্ঠী – মাকে বরণ করে নেওয়ার দিন
ষষ্ঠীর দিন থেকেই কলকাতার পুজো জমে ওঠে।
এই দিন বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আচার হয়। সহজ ভাষায় বললে, এই আচারগুলির মাধ্যমে দেবীকে পুজোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান করা হয়।
সন্ধ্যার পর থেকেই কলকাতার বিভিন্ন প্যান্ডেলে ভিড় বাড়তে শুরু করে।
যাঁরা তুলনামূলক কম ভিড়ের মধ্যে পুজো দেখতে চান, তাঁদের জন্য ষষ্ঠী বা সপ্তমীর প্রথম দিকের রাত ভালো সময় হতে পারে।
মহাসপ্তমী – নবপত্রিকা স্নান
সপ্তমীর সকালে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হল নবপত্রিকা স্নান।
অনেকে নবপত্রিকাকে সহজভাবে কলা বউ নামে চেনেন।
নবপত্রিকার মাধ্যমে প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের সঙ্গে দেবী আরাধনার একটি সুন্দর সম্পর্ক প্রকাশ পায়।
সপ্তমীর সন্ধ্যা থেকে কলকাতার প্যান্ডেল হপিং আরও জমে ওঠে।
মহাষ্টমী – অঞ্জলির দিন
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দিনগুলির একটি হল মহাষ্টমী।
এই দিন সকালে নতুন পোশাক পরে অনেকে পুজোমণ্ডপে যান এবং দেবীর সামনে পুষ্পাঞ্জলি দেন।
অনেক বড় পুজোয় কুমারী পুজোও অনুষ্ঠিত হয়।
আর অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় বিখ্যাত সন্ধিপুজো।
ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, প্রদীপের আলো এবং মন্ত্রোচ্চারণ—সব মিলিয়ে এই সময় কলকাতার পুজোমণ্ডপের পরিবেশ একেবারেই অন্যরকম হয়ে ওঠে।
মহানবমী – আনন্দের শেষ বড় দিন
নবমীর দিনও পুজোমণ্ডপে প্রচুর ভিড় থাকে।
অনেক জায়গায় হয় নবমী হোম, আর পুজোর ভোগ খাওয়ার জন্যও এই দিনটি বিশেষ জনপ্রিয়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় শুরু হয় শেষ রাতের প্যান্ডেল হপিং।
কারণ পরের দিনই মা দুর্গাকে বিদায় জানাতে হবে।
বিজয়া দশমী – বিদায়ের দিন
চারদিনের আনন্দের পর আসে বিজয়া দশমী।
বিবাহিত মহিলাদের মধ্যে অনেক পুজোমণ্ডপে সিঁদুর খেলা হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি।
কলকাতার বিভিন্ন ঘাটে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয়।
ঢাকের বাদ্য, “আসছে বছর আবার হবে” স্লোগান এবং চোখের জলে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা।
দেবীর বিসর্জনের সঙ্গে শেষ হয় দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক পর্ব।
কিন্তু বাঙালির মনে তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় পরের বছরের অপেক্ষা।
Kolkata Durga Puja-তে কী দেখবেন?
কলকাতায় পুজো দেখতে এলে শুধু প্রতিমা দেখলেই হবে না। পুরো শহরটাই তখন একটি বড় Festival Ground হয়ে ওঠে।
আপনি ঘুরে দেখতে পারেন—
উত্তর কলকাতা
- Bagbazar
- Kumartuli
- Ahiritola
- Hatibagan
- Sovabazar
মধ্য কলকাতা
- College Square
- Santosh Mitra Square
- Mohammad Ali Park
- Sealdah অঞ্চলের বিভিন্ন পুজো
দক্ষিণ কলকাতা
- Maddox Square
- Ekdalia Evergreen
- Ballygunge Cultural
- Deshapriya Park
- Tridhara Sammilani
- Chetla Agrani
প্রতিটি এলাকার পুজোর নিজস্ব Theme, প্রতিমা, আলো এবং পরিবেশ রয়েছে।
Durga Puja-এর আসল অর্থ কী?
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়।
পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে দেবী দুর্গা তাকে পরাজিত করেন।
তাই দুর্গাপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়—এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর জয় এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক।
আর বাঙালির কাছে মা দুর্গা শুধু দেবী নন।
তিনি ঘরের মেয়ে।
তাই তাঁর আগমনে আনন্দ, আর বিদায়ের সময় চোখে জল।
দুর্গাপুজোকে কয়েকটি শব্দে বোঝানো কঠিন।
এটি এমন একটি উৎসব, যেখানে পরিচিত-অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। রাত জেগে প্যান্ডেল দেখে, ঢাকের তালে নাচে, অঞ্জলি দেয়, ভোগ খায় এবং শেষ পর্যন্ত মাকে বিদায় জানায়।
মা দুর্গা আসেন কয়েক দিনের জন্য।
তারপর আবার ফিরে যান কৈলাসে।
কিন্তু তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া আনন্দ, স্মৃতি আর ভালোবাসা থেকে যায় আমাদের মনে।
আর দশমীর দিন তাই একটাই কথা—




