Howrah Bridge History in Bengali

Howrah Bridge History in Bengali | হাওড়া ব্রিজের সম্পূর্ণ ইতিহাস

কলকাতার কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে যে কয়েকটি ছবি ভেসে ওঠে, তার মধ্যে হাওড়া ব্রিজ অন্যতম। হুগলি নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এই ইস্পাতের সেতু শুধু কলকাতা ও হাওড়াকে যুক্ত করেনি, বরং বহু বছর ধরে শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু এই বিখ্যাত সেতুটি কীভাবে তৈরি হল? এর আগে কি এখানে কোনও সেতু ছিল? বর্তমান হাওড়া ব্রিজের নাম কেন রবীন্দ্র সেতু? আর এই সেতুর মধ্যে এমন কী বিশেষত্ব রয়েছে?

চলুন, খুব সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক হাওড়া ব্রিজের সম্পূর্ণ ইতিহাস

হাওড়া ব্রিজ কোথায়?

হাওড়া ব্রিজ বা রবীন্দ্র সেতু হুগলি নদীর উপর অবস্থিত। এটি হাওড়া শহরকে কলকাতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

হাওড়া স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু কলকাতার অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন ও পথচারীর চলাচল বহন করে।

আজকের হাওড়া ব্রিজ দেখলে মনে হতে পারে, এই সেতু যেন কলকাতার সঙ্গে চিরকালই ছিল। কিন্তু এর ইতিহাস আসলে আরও পুরনো।

বর্তমান হাওড়া ব্রিজের আগে কী ছিল?

আজ যে হাওড়া ব্রিজ আমরা দেখি, তার আগে একই অঞ্চলে ছিল একটি ভাসমান সেতু বা Pontoon Bridge

উনিশ শতকে কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যাতায়াত বাড়তে শুরু করেছিল। হুগলি নদীর উপর একটি স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজনও বাড়তে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৮৭৪ সালে একটি ভাসমান সেতু তৈরি করা হয়।

এই সেতুটি ছিল বর্তমান হাওড়া ব্রিজের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। নদীর উপর ভাসমান অংশের সাহায্যে সেতুটি তৈরি করা হয়েছিল এবং বড় জাহাজ চলাচলের সময় এর কিছু অংশ সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা ও হাওড়ার মানুষের সংখ্যা এবং যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে।

ফলে পুরনো সেতুটি আর সেই বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।

কেন নতুন হাওড়া ব্রিজের প্রয়োজন হল?

বিশ শতকের শুরুতে কলকাতা দ্রুত বড় শহরে পরিণত হচ্ছিল।

হাওড়া স্টেশন এবং কলকাতার মধ্যে মানুষের যাতায়াতও দ্রুত বাড়ছিল। পুরনো ভাসমান সেতুর উপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।

তাই একটি নতুন, শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী সেতু তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে নতুন সেতু তৈরির জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত একটি আধুনিক Balanced Cantilever Bridge তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নতুন হাওড়া ব্রিজের নির্মাণ শুরু

নতুন হাওড়া ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে

সেতুটির নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিল ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা Rendel, Palmer and Tritton

নির্মাণের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল Cleveland Bridge & Engineering Company এবং ভারতের Braithwaite, Burn & Jessop Construction Company

সেতু তৈরির সময় পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও এই সেতুর নির্মাণের সঙ্গে একটি মজার সম্পর্ক রয়েছে।

জার্মান কোম্পানি কেন কাজ পেল না?

নতুন হাওড়া ব্রিজ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে Tender ডাকা হয়েছিল।

একটি জার্মান কোম্পানি সবচেয়ে কম খরচে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তখন ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল।

এই কারণে জার্মান কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে নির্মাণের দায়িত্ব পায় ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রতিষ্ঠান Braithwaite, Burn & Jessop Construction Company

ইতিহাসের এই ঘটনাটি দেখায়, কীভাবে সেই সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতিও হাওড়া ব্রিজের নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।

কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল হাওড়া ব্রিজ?

হাওড়া ব্রিজ মূলত বিশাল পরিমাণ ইস্পাত দিয়ে তৈরি।

সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, সেতু তৈরিতে প্রায় ২৬,৫০০ টন স্টিল ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে বড় অংশ ছিল উচ্চ-শক্তির স্টিল।

কিন্তু সেতুটির সবচেয়ে অবাক করা বিষয় অন্য জায়গায়।

এই ব্রিজে সাধারণ Nuts and Bolts নেই!

হাওড়া ব্রিজের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর বিশাল স্টিলের কাঠামো মূলত Riveting পদ্ধতিতে যুক্ত করা হয়েছিল।

অর্থাৎ সাধারণভাবে আমরা যে Nuts এবং Bolts দেখতে অভ্যস্ত, সেগুলির পরিবর্তে হাজার হাজার Rivet ব্যবহার করে স্টিলের অংশগুলিকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

সেই সময়ের প্রযুক্তির কথা চিন্তা করলে এটি ছিল অত্যন্ত বড় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ।

হাওড়া ব্রিজ কবে চালু হয়?

বর্তমান হাওড়া ব্রিজ ১৯৪৩ সালে চালু হয়

তখন এর নাম ছিল New Howrah Bridge। কারণ এর আগে একই জায়গায় পুরনো একটি Howrah Bridge বা Pontoon Bridge ছিল।

West Bengal Tourism-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সেতুটি ১৯৪৩ সালে চালু হয় এবং পুরনো ভাসমান সেতুর পরিবর্তে এটি তৈরি করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেতুটি তৈরি হওয়ায় এর উদ্বোধনও ছিল বেশ সাধারণভাবে।

আজকের মতো বড় অনুষ্ঠান করে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়নি।

হাওড়া ব্রিজের আরেক নাম রবীন্দ্র সেতু কেন?

অনেকেই জানেন না, হাওড়া ব্রিজের সরকারি নাম রবীন্দ্র সেতু

১৯৬৫ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মানে নতুন হাওড়া ব্রিজের নাম পরিবর্তন করে Rabindra Setu করা হয়।

West Bengal Government-এর ১৯৬৫ সালের আইনে New Howrah Bridge-এর নাম Rabindra Setu করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

তবে নাম পরিবর্তন হলেও মানুষের মুখে হাওড়া ব্রিজ নামটিই এখনও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

হাওড়া ব্রিজের দৈর্ঘ্য কত?

হাওড়া ব্রিজের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২,১৫০ ফুট এবং এর প্রধান Span প্রায় ১,৫০০ ফুট

এটি একটি Balanced Cantilever Bridge

এই ধরনের সেতুতে মাঝখানে সাধারণ সেতুর মতো অনেক বড় Support বা Pier থাকে না। এর বিশেষ কাঠামো এবং দুই পাশের ভারসাম্যের মাধ্যমে সেতুটি নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই কারণেই হাওড়া ব্রিজকে শুধু একটি রাস্তার সেতু হিসেবে নয়, একটি অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং কীর্তি হিসেবেও দেখা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাওড়া ব্রিজ

হাওড়া ব্রিজ তৈরি হওয়ার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল।

কলকাতা তখন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী। তাই যুদ্ধের সময় শহরের উপর আক্রমণের আশঙ্কাও ছিল।

হাওড়া ব্রিজ কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এর নিরাপত্তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধের সেই কঠিন সময় পার করেও ব্রিজটি আজ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে।

হাওড়া ব্রিজ শুধু একটি সেতু নয়

আজকের দিনে হাওড়া ব্রিজ শুধু কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যাতায়াতের মাধ্যম নয়।

এটি কলকাতার পরিচয়ের একটি অংশ।

কলকাতার সিনেমা, সাহিত্য, ফটোগ্রাফি, গান এবং ভ্রমণের গল্পে বারবার ফিরে আসে এই সেতু।

ভোরবেলা হুগলি নদীর উপর কুয়াশার মধ্যে হাওড়া ব্রিজের দৃশ্য যেমন সুন্দর, তেমনই সন্ধ্যায় আলোয় সজ্জিত ব্রিজের চেহারা সম্পূর্ণ অন্যরকম।

হুগলি নদী থেকে Ferry-তে বসে হাওড়া ব্রিজ দেখলে এর বিশালত্ব আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

প্রতিদিন কত মানুষ হাওড়া ব্রিজ ব্যবহার করেন?

হাওড়া ব্রিজ এখনও কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের পথ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি যানবাহন এবং বিপুল সংখ্যক পথচারী এই সেতু ব্যবহার করেন।

অর্থাৎ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও সেতুটির গুরুত্ব একটুও কমেনি।

বরং কলকাতার ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে হাওড়া ব্রিজ আরও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

হাওড়া ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ কে করে?

এত পুরনো এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

Syama Prasad Mookerjee Port, Kolkata—যা আগে Kolkata Port Trust নামে পরিচিত ছিল—হাওড়া ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে। National Portal of India-ও এই বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

সময়ের সঙ্গে সেতুর বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা, প্রয়োজনীয় মেরামতি করা এবং কাঠামোর নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়।

হাওড়া ব্রিজের সঙ্গে কলকাতার আবেগ

একজন কলকাতাবাসীর কাছে হাওড়া ব্রিজ শুধুমাত্র ইস্পাতের তৈরি একটি সেতু নয়।

কারও কাছে এটি অফিস যাওয়ার রাস্তা।

কারও কাছে প্রথম কলকাতা ভ্রমণের স্মৃতি।

কারও কাছে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে কলকাতাকে প্রথম দেখার মুহূর্ত।

আবার কারও কাছে এটি গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে দেখা এক চেনা দৃশ্য।

বছরের পর বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই সেতুর উপর দিয়ে হেঁটেছে, গাড়িতে চড়েছে এবং কলকাতার সঙ্গে নিজেদের জীবনের গল্প জুড়ে দিয়েছে।

হাওড়া ব্রিজ আজও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সময় বদলেছে। কলকাতায় আরও অনেক সেতু তৈরি হয়েছে। কিন্তু হাওড়া ব্রিজের গুরুত্ব এখনও আলাদা।

কারণ এটি একই সঙ্গে—

  • একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা
  • একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা
  • একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়
  • কলকাতার একটি পরিচয়
  • পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় আকর্ষণ
  • এবং বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম

২০২৫ সালে কেন্দ্রের Press Information Bureau-ও হাওড়া ব্রিজকে কলকাতার একটি iconic landmark হিসেবে উল্লেখ করে এবং এর দৈর্ঘ্য, উচ্চতা ও দৈনিক যান চলাচলের তথ্য প্রকাশ করে।

শেষ কথা

হাওড়া ব্রিজের দিকে তাকালে আমরা হয়তো শুধু একটি বিশাল স্টিলের সেতু দেখি।

কিন্তু এর প্রতিটি অংশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার দীর্ঘ ইতিহাস।

পুরনো ভাসমান সেতু থেকে বর্তমান রবীন্দ্র সেতু, ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজকের ব্যস্ত মহানগর—সবকিছুর সাক্ষী এই সেতু।

তাই হাওড়া ব্রিজ শুধু হাওড়া ও কলকাতাকে যুক্ত করেনি। এটি যুক্ত করেছে কলকাতার অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে।

আজও হুগলি নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল ইস্পাতের কাঠামো যেন আমাদের বলে—

সময় বদলায়, শহর বদলায়, কিন্তু কিছু ইতিহাস থেকে যায়।

আর সেই ইতিহাসের নাম—

হাওড়া ব্রিজ, অর্থাৎ রবীন্দ্র সেতু।

Search
Our Banner

Latest Posts