History Behind the Names of Famous Places in Kolkata
কলকাতা শুধু একটি শহর নয়—এ শহরের প্রতিটি গলি, পাড়া, রাস্তা ও বাজারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বছরের ইতিহাস। কুমোরটুলি, শোভাবাজার, বাগবাজার, হাতিবাগান, চিৎপুর, শ্যামবাজার, বউবাজার, বড়বাজার—আজকের ব্যস্ত কলকাতার এই পরিচিত নামগুলির পেছনে রয়েছে রাজপরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম, কারিগরি পেশা, ব্রিটিশ আমল এবং লোককথার নানা গল্প।
তবে মনে রাখা দরকার, অনেক জায়গার নামকরণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। তাই যেখানে ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত তথ্য নেই, সেখানে আমরা প্রচলিত মত বা লোককথা হিসেবেই বিষয়টি উল্লেখ করছি।
চলুন, কলকাতার পরিচিত কিছু জায়গার নামের পেছনের গল্প জেনে নেওয়া যাক।
🏺 ১. কুমোরটুলি | Kumartuli
কুমোরটুলি নামটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে মৃৎশিল্পীদের ইতিহাস। শোভাবাজার রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর জন্য কৃষ্ণনগর অঞ্চল থেকে কুমোর ও মৃৎশিল্পীদের কলকাতায় এনে বসতি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। সেই কুমোরদের বসতি থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার নাম হয় কুমোরটুলি।
আজও কুমোরটুলি কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিমা তৈরির কেন্দ্র, বিশেষ করে দুর্গাপুজোর সময় এখানকার শিল্পীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো।
🏘️ ২. শোভাবাজার | Shobhabazar
শোভাবাজারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শোভারাম বসাক-এর নাম। অষ্টাদশ শতকে কলকাতার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত জমি ও বসতির সূত্র ধরেই শোভাবাজার নামটির প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়।
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো অবশ্য আজও কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পুজো।
🌸 ৩. বাগবাজার | Bagbazar
বাগবাজার নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ‘বাগ’ শব্দটি ফারসি ভাষায় বাগান অর্থে ব্যবহৃত হয়, আর ‘বাজার’ অর্থ বাজার। ফলে এক মত অনুযায়ী, এখানে বাগান ও বাজার—দুইয়ের উপস্থিতি থেকেই নামটি এসেছে।
আরেকটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, একসময় এই অঞ্চলে ফুলের বাগান বা ফুলের বাজার ছিল। তবে কোন ব্যাখ্যাটি নিশ্চিতভাবে সঠিক, তা বলা কঠিন।
🐘 ৪. হাতিবাগান | Hatibagan
হাতিবাগান নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুটি জনপ্রিয় কাহিনি।
একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, ১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের সময় তাঁর হাতিগুলি এই অঞ্চলে রাখা হয়েছিল, তাই নাম হয় হাতিবাগান।
অন্য একটি মত অনুযায়ী, ‘হাতি’ ছিল কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির উপাধি এবং তাঁর বাগানবাড়ি থেকেই এলাকার নামটি প্রচলিত হয়।
🌙 ৫. সোনাগাছি | Sonagachi
কলকাতার অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক এলাকার নাম সোনাগাছি। প্রচলিত মত অনুযায়ী, এই নামটি সোনাউল্লাহ গাজী নামে এক সুফি সাধকের নাম থেকে এসেছে।
এই এলাকার ইতিহাস বহুস্তরীয় এবং ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে। তাই শুধু বর্তমান পরিচয়ের মাধ্যমে সোনাগাছির দীর্ঘ ইতিহাসকে বোঝা যায় না।
🛍️ ৬. বউবাজার | Bowbazar
একসময় এই এলাকার নাম ছিল বহুবাজার। নামটির উৎপত্তি নিয়ে দুটি মত বেশি প্রচলিত।
একটি মত অনুযায়ী, এখানে বিভিন্ন ধরনের বহু বাজার ছিল, তাই নাম হয় বহুবাজার। অন্য একটি মত অনুসারে, এলাকার বাজারের সঙ্গে কোনো ধনী পরিবারের পুত্রবধূর সম্পত্তির সম্পর্ক থেকেই ‘বউবাজার’ নামটি এসেছে।
সময়ের সঙ্গে বহুবাজার → বউবাজার নামটি প্রচলিত হয়ে যায়।
🔔 ৭. ঠনঠনিয়া | Thanthania
ঠনঠনিয়া নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শব্দের গল্প। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, এখানে লোহার কাজ হওয়ায় সারাদিন ঠন ঠন শব্দ শোনা যেত। সেই থেকেই নাম ঠনঠনিয়া।
আরেকটি লোককথায় বলা হয়, ডাকাতের আক্রমণের আশঙ্কা হলে মন্দিরের ঘণ্টা বাজিয়ে মানুষকে সতর্ক করা হতো। সেই ঘণ্টার ঠনঠন শব্দ থেকেই নামটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।
🌳 ৮. চিৎপুর | Chitpur
চিৎপুরের ইতিহাস কলকাতার প্রাচীনতম বসতিগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। প্রচলিত কাহিনিতে চিতে ডাকাত এবং চিত্তেশ্বরী দেবী-র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
একটি মত অনুযায়ী, চিত্তেশ্বরী দেবীর মন্দিরকে কেন্দ্র করেই এলাকার নাম চিৎপুর হয়েছে। তবে নামটির উৎস নিয়ে ঐতিহাসিক ও লোককথাভিত্তিক একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
🦚 ৯. শ্যামবাজার | Shyambazar
শ্যামবাজারের নামের সঙ্গে শোভারাম বসাকের গৃহদেবতা শ্যামরায়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে একটি প্রচলিত মত আছে। অন্যদিকে, শ্যামপুকুর নামের একটি পুকুর থেকেও শ্যামবাজার নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলে মত রয়েছে।
অর্থাৎ শ্যামবাজারের নামের ইতিহাসেও একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
🛒 ১০. বড়বাজার | Burrabazar
আজকের কলকাতার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র বড়বাজার। নামটি শুধু বাজারের আকার থেকে এসেছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
নামটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে এবং ‘বড়া বাজার’ থেকে বর্তমান বড়বাজার নামটি প্রচলিত হয়েছে বলে একটি মত রয়েছে।
🚓 ১১. লালবাজার | Lalbazar
আজ কলকাতা পুলিশের সদর দফতর হিসেবে লালবাজারকে আমরা চিনি। তবে এলাকার নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
‘লালবাজার’ নামটি ব্রিটিশ আমলের পুরনো কলকাতার সঙ্গে যুক্ত। লাল রঙের ভবন বা বাজার—এমন নানা ব্যাখ্যা প্রচলিত থাকলেও নির্দিষ্ট একটি ব্যাখ্যাকে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা কঠিন।
🏞️ ১২. লালদিঘি | Lal Dighi
বর্তমান বিবি ডি বাগ অঞ্চলের ঐতিহাসিক জলাশয়টি একসময় লালদিঘি নামে পরিচিত ছিল। নামটির উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী, দোল উৎসবের সময় রঙের কারণে জলের রং লাল হয়ে যেত।
আরেকটি মত অনুযায়ী, দিঘির পাশে থাকা লাল রঙের একটি ভবনের প্রতিবিম্ব জলে পড়ত বলেই নাম হয় লালদিঘি।
🏙️ কলকাতার আরও কিছু বিখ্যাত নামের ইতিহাস
🌳 ১৩. চৌরঙ্গী | Chowringhee
চৌরঙ্গী নামটি কলকাতার ব্রিটিশ আমলেরও আগের। নামটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় নাথ সম্প্রদায়ের সাধক চৌরঙ্গীনাথ-এর সঙ্গে নামটির সম্পর্কের কথা বলা হয়।
ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, ব্রিটিশ কলকাতা গড়ে ওঠার আগেই চৌরঙ্গী একটি পরিচিত এলাকা ছিল।
🌲 ১৪. পার্ক স্ট্রিট | Park Street
আজকের কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় রাস্তা পার্ক স্ট্রিট। কিন্তু এর পুরনো পরিচয় ছিল Burial Ground Road বা Burial Ground Street, কারণ এই পথ দিয়ে একাধিক কবরস্থানে যাওয়া যেত।
পরে Sir Elijah Impey-র বিশাল বাগান এবং ‘deer park’-এর সঙ্গে নামটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি মত রয়েছে। ১৭৬০-এর দশকের নথিতেও এই রাস্তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
🎭 ১৫. থিয়েটার রোড | Theatre Road
বর্তমান শেক্সপিয়র সরণি একসময় পরিচিত ছিল Theatre Road নামে। ব্রিটিশ কলকাতায় থিয়েটার ও বিনোদনের সঙ্গে এই এলাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
বিশেষ করে Chowringhee Theatre-এর উপস্থিতির কারণে রাস্তার সঙ্গে থিয়েটারের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ১৯৬৪ সালে William Shakespeare-এর স্মরণে এর নাম হয় Shakespeare Sarani।
🏫 ১৬. ফ্রি স্কুল স্ট্রিট | Free School Street
Free School Street নামটি একটি স্কুলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ১৮শ শতকে প্রতিষ্ঠিত Free School-এর সঙ্গে সম্পর্কিত এই রাস্তার নাম পরবর্তীকালে Free School Street হিসেবে পরিচিত হয়।
বর্তমানে রাস্তার সরকারি নাম Mirza Ghalib Street, কিন্তু পুরনো নামটি এখনও কলকাতাবাসীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত।
🕌 ১৭. ধর্মতলা | Dharmatala
কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধর্মতলা। এই নামের সঙ্গে ধর্মীয় স্থাপনা ও স্থানীয় ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে।
একটি মত অনুযায়ী, ধর্মঠাকুরের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ‘ধর্মতলা’ নামটির সম্পর্ক থাকতে পারে।
🚤 ১৮. উল্টোডাঙা | Ultadanga
উল্টোডাঙা নামটি নিয়ে প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা বেশ মজার। একসময় এই অঞ্চলের খালের ধারে নৌকা বা ডিঙি উল্টে রেখে তাতে আলকাতরা লাগানোর কাজ করা হতো বলে কথিত আছে।
সেখান থেকেই উল্টোডিঙি → উল্টোডাঙা নামটির প্রচলন হয়েছে বলে একটি লোকমত রয়েছে।
🐗 ১৯. বরাহনগর | Baranagar
বরাহনগর নামের উৎপত্তি নিয়েও লোকমত রয়েছে। ‘বরাহ’ শব্দের অর্থ শূকর; একসময় এই অঞ্চলে শূকরের উপস্থিতি বেশি ছিল বলে নামটি এসেছে—এমন একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে না দেখে লোকপ্রচলিত মত হিসেবেই দেখা উচিত।
🏘️ ২০. সুতানুটি | Sutanuti
কলকাতার ইতিহাস বুঝতে হলে সুতানুটি নামটি অবশ্যই জানতে হয়। আজকের উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশের সঙ্গে যুক্ত এই প্রাচীন বসতি ছিল সুতানুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর—এই তিনটি গ্রামের অন্যতম।
Kolkata Municipal Corporation-এর ইতিহাস অনুযায়ী, এই তিনটি গ্রামকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে কলকাতা শহরের বিকাশ ঘটে।
🌿 ২১. গোবিন্দপুর | Gobindapur
গোবিন্দপুর ছিল প্রাচীন কলকাতার তিনটি প্রধান গ্রামের একটি। নামটি ‘গোবিন্দ’ নামের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ কলকাতার বিকাশ এবং নতুন Fort William নির্মাণের সময় এই এলাকার ভূগোল ও জনবসতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
🌊 ২২. গঙ্গার ঘাটগুলির নাম
কলকাতার অনেক ঘাটের নামও শহরের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চাঁদপাল ঘাট, বাবুঘাট, প্রিন্সেপ ঘাট, আহিরীটোলা ঘাট—প্রতিটি নামের পেছনেই রয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, বাণিজ্য অথবা ঐতিহাসিক ঘটনার গল্প।
বিশেষ করে কলকাতার নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশে এই ঘাটগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
🏛️ কলকাতার নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শহরের ইতিহাস
কলকাতার নামগুলো আসলে একেকটি Historical Story। কোথাও মৃৎশিল্পীদের বসতি থেকে কুমোরটুলি, কোথাও রাজপরিবার ও ব্যবসায়ীদের স্মৃতি থেকে শোভাবাজার, কোথাও বাজার ও বাণিজ্য থেকে বড়বাজার, আবার কোথাও ঔপনিবেশিক কলকাতার ইতিহাস থেকে পার্ক স্ট্রিট ও থিয়েটার রোড।
আর কলকাতার মূল নাম কলকাতা/কলিকাতা নিয়েও একাধিক মত রয়েছে। দেবী কালী, ‘কালীক্ষেত্র’, খাল বা স্থানীয় শব্দ—বিভিন্ন ব্যাখ্যা ইতিহাসে পাওয়া যায়; কোন একটি ব্যাখ্যাকে নিশ্চিতভাবে চূড়ান্ত বলা যায় না। কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর—এই তিনটি প্রাচীন গ্রামের ইতিহাস অবশ্য শহরের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই পরের বার কলকাতার কোনও রাস্তা বা পাড়ার নাম শুনলে শুধু ঠিকানা হিসেবে দেখবেন না—একবার ভাবুন, এই নামটির পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে কয়েকশো বছরের একটি গল্প।





No Comment! Be the first one.